মোমিনুর রহমান:
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দিন দিন বাড়ছে আমদানি-রপ্তানি, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারি রাজস্বের পরিমাণও। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো সংকট, দীর্ঘায়িত পার্কিং জট ও শেডের অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গত ১লা সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত বন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের বক্তব্য ও চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
ভোমরা কাস্টমস হাউজ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) এই বন্দর দিয়ে ১৫ লাখ ৪ হাজার ১৭০ টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ১,৬৮৬ কোটি টাকা।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ৫৯ হাজার ৬৯৩টি ট্রাকে ৮ হাজার ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ২০ লাখ ৮২ হাজার টন পণ্য আমদানি এবং ২ হাজার ৯৩৭টি ট্রাকে ৩ হাজার ৪০৬ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়।
প্রায় ২,৫০০ ট্রাক, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২২০ কোটি টাকা। প্রধান আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, কয়লা, পাথর, কাঁচা মরিচ, ফল ও বিভিন্ন কাঁচামাল।
প্রায় ৩৫০ ট্রাক, যার মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, জুট ইয়ার্ন, জুস ও চিপস।
এই ৭ দিনেই প্রায় ২১-২৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের গড় রাজস্ব প্রায় ৩ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে এই বন্দর থেকে মোট প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
ভোমরা কাস্টমস হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির একটি বড় অংশ ভোমরাসহ স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আমরা রপ্তানি পণ্য দ্রুত ছাড়করণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বদ্ধপরিকর।
ভোমরা স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক মামুন কবির তরফদার বলেন, বন্দরের গতিশীলতা বাড়াতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অত্যন্ত জরুরি। ভোমরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
ভোমরা স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, বন্দর উন্নয়নে নতুন ২৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর আওতায় নতুন পার্কিং ইয়ার্ড, শেড ও ওয়্যারহাউজ নির্মিত হবে, যা বাস্তবায়িত হলে বন্দরের ধারণক্ষমতা দ্বিগুণে উন্নীত হবে।
ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা বলেন, ভারতীয় বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি একটি বড় অর্জন। তবে অন্যান্য বন্দরে ফল আমদানিতে ওজন ও শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হলেও ভোমরায় তা দেওয়া হয় না, ফলে এখানকার ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ গুণতে হয়।
একই সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, অন্যান্য বন্দরে প্রতি ট্রাক ডালিমে কার্টনের ওজন বাদ দেওয়া হয় এবং ১০ টনে ২ টন পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু ভোমরায় কোনো ছাড় না থাকায় ফল ব্যবসায়ীরা অন্য বন্দরমুখী হচ্ছেন এবং ভোমরা বন্দর রাজস্ব হারাচ্ছে।
ভোমরা আমদানি-রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী জানান, পর্যাপ্ত পার্কিং ও শেডের অভাবে আমদানি পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। দ্রুত এই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যবসা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু ভোমরা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সাতক্ষীরা বড়বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রজব আলী বলেন, ভোমরা দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হওয়ার ফলে স্থানীয় বাজারে এর দাম ৩০০ টাকা থেকে কমে ২৫০ টাকায় নেমে এসেছে। আমদানি অব্যাহত থাকলে এর দাম আরও কমে আসবে।
কয়লা আমদানিকারক আব্দুল জলিল জানান, ইটভাটার মৌসুম সামনে থাকায় কয়লার চাহিদা অনেক বেশি। তাই ভোমরায় কয়লার জন্য দ্রুত একটি আলাদা ইয়ার্ড তৈরি করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ভোমরা বন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করছে। অথচ ভেতরের পার্কিং ইয়ার্ডে মাত্র ২০০টি ট্রাক রাখার মতো সীমিত জায়গা রয়েছে। এর ফলে প্রায়ই মূল সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
তবে আশার কথা হলো, সরকারের নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৪০০ ট্রাক ধারণক্ষমতার নতুন পার্কিং ইয়ার্ড, ২টি ট্রান্সশিপমেন্ট শেড এবং ৩টি আধুনিক ওয়্যারহাউজ নির্মিত হবে। ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করছেন, এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং বার্ষিক রাজস্ব আদায় ১,১০০ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাবে।




No comments:
Post a Comment