ads

শিরোনাম :

আশাশুনিতে নিরাপত্তার নামে আতঙ্ক

 

গোয়েন্দা সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগ



মোহাম্মদ মুজাহিদঃ



সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মরত কর্পোরাল হুমায়ুনের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষি ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ড্রেজার মেশিন ও বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মাসিক টাকা না দিলে প্রশাসনিক ঝামেলা, মামলা বা হয়রানির ভয় দেখানো হয় । একইভাবে বিভিন্ন মৎস্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ দাবি করা হয় বলে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ উঠে এসেছে মহাজনপুর বিলের একটি ঘটনায়। স্থানীয়দের দাবি, রাতের বেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি দুই যুবক ইমরান ও তারেক কে তুলে নিয়ে মারধর করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তাদের ওপর এলোপাথাড়ি হামলা চালানো হয় এবং পরে ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করতে বাধ্য হন পরিবার।

আরেক ঘটনায় আশাশুনির আনুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ ফজর আলী গাজীর ছেলে রফিকুল ইসলামের ওপর তল্লাশির নামে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, তাকে আটক করে মাদক উদ্ধারের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয় এবং একটি মামলায় আসামি করা হয়। ভুক্তভোগীর স্বজনদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ভয়ভীতি ও চাপ সৃষ্টি করার অংশ।

স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য কি সরাসরি অভিযান চালিয়ে কাউকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন? আইনগতভাবে এসব কার্যক্রমের ক্ষমতা ও সীমা কী? তা নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রমে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন জরুরি। কোনো সংস্থার সদস্য যদি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিযান পরিচালনা করেন, তবে সেটি আইনগত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা হোক। তারা বলছেন, নিরাপত্তা সংস্থার নাম ব্যবহার করে যদি কেউ ব্যক্তিস্বার্থে হয়রানি করে, তবে তা শুধু আইনের শাসনের জন্য নয় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর।

স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিষয়টি জানতে অভিযুক্ত হুমায়ুনের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন নীতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্য একটা প্রশ্নে তিনি বলেন আমি সার্জেন্ট সেনাবাহিনীর অনেক আগে থেকে। তাছাড়া আমার বিরুদ্ধে যেগুলো বলছেন তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আপনি তদন্ত করে দেখেন। 

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা ডিজিএফআই এর উপপরিচালক রেজাউল হকের সাথে কথা হলে তিনি আশ্বস্ত করেন– কোন অপরাধী আমার কাছ থেকে ছাড় পাবে না। আপনি ভুক্তভোগীদের আমার কাছে পাঠান। আমি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

আশাশুনির ঘটনাগুলো এখন শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, এটি আইনের প্রয়োগ, জবাবদিহিতা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিযোগ সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং মিথ্যা হলে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরিহার্য।

জনগণের প্রত্যাশা একটাই আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এবং নিরাপত্তার নামে যেন আর কোনো নাগরিককে ভয় ও নির্যাতনের মুখে পড়তে না হয়।

No comments