নায়েব আশরাফুজ্জামানের কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ
সম্পদের উৎসের তদন্ত দাবি সচেতন মহলের
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব আশরাফুজ্জামান ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তিনি সাতক্ষীরা ও খুলনায় গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি। সরকারি জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার নামে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ এখন লোকমুখে।
সম্প্রতি আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দোকানঘর বরাদ্দে মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এরপর আস্তে আস্তে তার দুর্নীতির মহাযজ্ঞ সামনে আসতে শুরু করে। তবে দোকানঘর বরাদ্দে মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের পর সংবাদ প্রকাশ করলে টনক নড়ে দুর্নীতিবাজ নায়েব আশরাফুজ্জামানের। বিষয়টি মিমাংসা করতে শুরু করেন বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাপ। অবশেষে ভুক্তভোগী জি.এম. আবুল বাশারের টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে ভুক্তভোগী টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ধুরন্ধর নায়েব টাকা ফেরত দেবে না বলে বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা ফেরত দেওয়ার গুজব রটিয়েছেন।
ভুক্তভোগী আটুলিয়া ইউনিয়নের ০২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য জি.এম. আবুল বাশার সূত্রে জানা গেছে, সরকারি জায়গায় দোকানঘর বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নায়েব তার থেকে তিন লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছে। একটি লাল রঙের শপিং ব্যাগে করে ওই অর্থ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে তিনি প্রদান করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দোকানঘর বরাদ্দ না পেয়ে তিনি টাকা ফেরত চাইলে তাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে টালবাহানা করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের বসুন্ধরা পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশের পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নায়েব আশরাফুজ্জামান ভুক্তভোগীর কাছে তিন লাখ টাকা ফেরত দেন। এতে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নায়েব আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিলাসবহুল রাজ হোটেলের পূর্ব পাশে ১ কোটি ২ লাখ টাকা মূল্যের একটি দুই তলা বাড়িসহ জমি ক্রয় করেছেন। এখানেই শেষ নয়, শহরের আমতলা মোড়ে আরও একটি দুই তলা বাড়ি ও দুটি দোকান কিনেছেন যার বাজারমূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। নিজের অবৈধ উপার্জনকে আড়াল করতে তিনি শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নামেও সম্পদ গড়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকায় শ্বশুরের নামে ৫ শতক আম বাগান কিনেছেন, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
বর্তমানে আটুলিয়া ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালীন তার দুর্নীতির মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, নওয়াবেঁকী বাজারে সরকারি পেরিফেরিভুক্ত জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার নাম করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
দালাল সিন্ডিকেট স্থানীয়রা জানান, ‘শাহাদাৎ’ নামের এক বিশ্বস্ত দালালের মাধ্যমে তিনি প্রতিটি প্লট ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করছেন। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্র ও বন্দোবস্তর আশ্বাস দিয়ে এই বাণিজ্য চালানো হচ্ছে।
একজন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার (নায়েব) বেতন ও বৈধ আয়ের সাথে এই বিপুল সম্পদের কোনো সংগতি নেই। তার নামে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়লেও রহস্যজনক কারণে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। তার এই নামে-বেনামে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। স্থানীয়দের দাবি, দুদক (দুদক) তদন্ত করলে তার আরও ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত নায়েব আশরাফুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
শ্যামনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি রাশেদ হোসাইন জানান, নায়েব আশরাফুজ্জামানের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, টাকা ফেরত দেওয়া মানেই দায়মুক্তি নয়; বরং পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের দুর্নীতি ভবিষ্যতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

No comments