উপকূলের বিষফোঁড়া ‘ব্ল্যাক ডগ’ সিন্ডিকেট সীমান্ত ও সুন্দরবনে অস্ত্রের ঝনঝনানি, জিম্মি জনপদ
নিজস্ব প্রতিনিধি :
সুন্দরবনের গহিন অরণ্য, ভারত সীমান্ত আর কালিন্দী-খোলপেটুয়াসহ পাঁচ নদীর মোহনা—প্রাকৃতিক এই বৈচিত্র্যকেই অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে একটি দুর্ধর্ষ চক্র। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ও সংলগ্ন উপকূলীয় জনপদে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে ‘ব্ল্যাক সিন্ডিকেট’। জলদস্যুতা, আন্তঃদেশীয় অস্ত্র চোরাচালান, মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের মাধ্যমে এই চক্রটি এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে জামির আলী জামু, আব্দুল্লাহ তরফদার এবং আরএস খান (ওরফে ব্ল্যাক ডগ)। তাদের জালের বিস্তার প্রতিবেশী দেশ ভারত পর্যন্ত।
সিন্ডিকেটের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত গোলাখালী গ্রামের সিয়াম উদ্দিনের ছেলে জামির আলী জামু। নথিপত্র অনুযায়ী, জামুর বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় তিনটি এবং সাতক্ষীরা সদর ও খুলনার বটিয়াঘাটায় একটি করে অস্ত্র মামলাসহ একাধিক মাদক ও চোরাচালান মামলা রয়েছে।
জামু মূলত সুন্দরবনের জলদস্যুদের ভারী অস্ত্রের প্রধান জোগানদাতা। ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সে সুন্দরবন ও ভারতের মধ্যবর্তী রুটটি নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে এসে জামু আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর শারীরিক নির্যাতন ও তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি দখলের নেপথ্য কারিগর এই জামু। তার ভয়ে এলাকাছাড়া হয়েছেন অনেক সংখ্যালঘু পরিবার।
সিন্ডিকেটের দ্বিতীয় প্রভাবশালী সদস্য কালইঞ্চি গ্রামের আব্দুল্লাহ তরফদার। বর্তমানে সে ভারতে অবস্থান করে পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালনা করছে। আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে নারী পাচার, ধর্ষণ, ইয়াবা ও অস্ত্র মামলাসহ ডজনখানেক মামলা রয়েছে। ভারতীয় সিন্ডিকেটের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে মাদক ও অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে পাঠানোর মূল দায়িত্ব তার।
পশ্চিম কৈখালী গ্রামের আরএস খান বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে আলোচিত নাম। অন্ধকার জগতে সে ‘ব্ল্যাক ডগ’ নামে পরিচিত। মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হওয়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে রয়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, আরএস খানের মূল টার্গেট হলো হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করে তাদের জমি দখল করা। কোনো সাংবাদিক বা প্রতিবাদী মানুষ তার কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করলে তাকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। দম্ভোক্তি করে সে বলে বেড়ায়, “প্রশাসন বা পত্রিকা আমার কিছুই করতে পারবে না।”
এই সিন্ডিকেটের শেকড় বিস্তৃত ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং পর্যন্ত। কলকাতার ক্যানিং এলাকার বাসিন্দা যোগেশ (পিতা: কৃষ্ণপদ) এই চক্রের প্রধান ভারতীয় সরবরাহকারী। কলকাতা পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, যোগেশ একাধিকবার গ্রেফতার হলেও তার চোরাচালান নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে। সে মূলত আরএস খান ও জামুর মাধ্যমে ভারতীয় নিষিদ্ধ ওষুধ ও মরণঘাতী মাদক বাংলাদেশে পাচার করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রমজাননগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র বহন করে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না। সংবাদকর্মীরা তথ্য সংগ্রহে গেলে তাদের ঘিরে ধরা হয় এবং বড় ধরনের বিপদের হুমকি দেওয়া হয়।
উপকূলীয় এই অপরাধী চক্রের প্রভাবে বর্তমানে সুন্দরবনের মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের জীবনও হুমকির মুখে। যৌথ বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার অভিযান চালালেও দুর্গম এলাকা এবং প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেট সম্পর্কে তারা অবগত আছেন এবং তাদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি—জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান (ক্লিন হার্ট স্টাইল) পরিচালনা করে এই ‘ব্ল্যাক সিন্ডিকেট’ নির্মূল করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই উপকূলীয় অঞ্চল অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।

No comments