কালিগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা ‘টেমি হাফিজ’কে ঘিরে নানা অভিযোগ, গ্রেপ্তারের দাবি ভুক্তভোগীদের
কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার আলোচিত ব্যক্তি হাফিজুর রহমান ওরফে ‘টেমি হাফিজ’-কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, প্রভাব খাটানো, মিথ্যা মামলা, ব্ল্যাকমেইল এবং অর্থ আদায়ের নানা অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়ে আসছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থানা ও ডিবি-পুলিশকে ব্যবহার করে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।
ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচয় দেওয়া জামায়াত ও বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, ২০১৩ সালে কালিগঞ্জের ফুলতলা মোড়ে হাফিজ ও তার সহযোগী হাবিব জামায়াত ও বিএনপির মিছিলে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন নেতাকর্মী ও সমর্থকদের তালিকা প্রস্তুত করে থানাও ডিবি-পুলিশের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করানো এবং পরে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মামলা থেকে অব্যাহতি কিংবা গ্রেপ্তার এড়ানোর আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হতো বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি, ছাত্রদলের সভাপতি, যুবদলের সভাপতি এবং জামায়াতের একাধিক নেতা সাক্ষ্য দিতে পারবেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাফিজুর রহমান চাম্পাফুল ইউনিয়নের মশরকাটি গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত এলাহী বক্স গাজীর তিন পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ। স্থানীয়দের দাবি, পিতার জীবদ্দশায় তার মাদকাসক্তি, বেপরোয়া জীবনযাপন, একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক এবং সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কালিগঞ্জের ফুলতলা এলাকায় ভাড়াবাসায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে সেটেলমেন্ট দালালি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কালিগঞ্জ বাজার গ্রাম এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটক করে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় তিনি ‘টেমি হাফিজ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন বলে দাবি করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বাসা পরিবর্তন করে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করলেও তিনি পুনরায় মাদক কারবার, দালালি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কখনো সাংবাদিক, কখনো গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ঠিকাদার, ফল ব্যবসায়ী, মৎস্যঘের ব্যবসায়ী, বালু ও ইটভাটা মালিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, জেলার আলোচিত ডাকাত ইয়ার আলী ও বাহার আলী চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যারা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রদান করেন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে হয়রানির চেষ্টা করা হয়। এতে পুলিশ প্রশাসন, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিরাও অনেক সময় বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তার সহযোগীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরের মাধ্যমে দ্রুত মুক্ত করার চেষ্টা করা হতো। একাধিক সূত্রের দাবি, তাদেরকে অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদক সরবরাহের মাধ্যমেও সহযোগিতা করা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সহযোগীদের ব্যবহার করে চুরি, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কেউ গ্রেপ্তার হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশ এবং বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করে হয়রানি করার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দ্রুত টেমি হাফিজকে গ্রেপ্তার করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।


No comments