শিরোনাম :

বহুমাত্রিকতার অনিন্দ্য আলো: লেখালেখি দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত শাম্মী তুলতুল



এ.এস.এম হামিদ হাসান 

​বিশেষ প্রতিনিধি:


চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ মাটি থেকে উঠে এসে নিজের মেধা ও মননের আলোয় দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গন আলোকিত করেছেন যিনি, তিনি শাম্মী তুলতুল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে যাঁরা বহুমাত্রিক প্রতিভা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে এক আলোচিত ও জনপ্রিয় নাম। কেবল দেশের গণ্ডিতেই নয়, তাঁর কলমের জাদু আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের গৌরব।


​ঐতিহ্যের শিকড় ও আলোকিত শৈশব

একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম শাম্মী তুলতুলের। ফলে সাহিত্যচর্চার বীজটি যেন তাঁর রক্তেই মিশে ছিল। তাঁর দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, লেখক এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। অন্যদিকে, তাঁর নানী কাজী লতিফা হকও ছিলেন তৎকালীন সংবাদপত্রের একজন সুপরিচিত লেখক। এমন এক চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতির আলোকিত পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠাই তুলতুলকে করে তুলেছে অনন্য। শৈশবে ডানপিটে ও প্রাণবন্ত এই মানুষটির নাচ, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলাসহ সব কিছুতেই ছিল সমান পারদর্শিতা।


​সংবাদপত্র থেকে বিশ্বমঞ্চে পদচারণা

শৈশব থেকেই দেশের প্রথম সারির দৈনিকগুলোতে নিয়মিত লিখছেন শাম্মী তুলতুল। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর, মানবকণ্ঠ, প্রতিদিনের সংবাদ, আমাদের সময়, খোলা কাগজ, আজাদী, পূর্বকোণ এবং শিশু নবারুণসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর শক্তিশালী লেখনী স্থান করে নিয়েছে প্যারিস, কানাডা, নিউ ইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির বাংলা পত্র-পত্রিকাতেও। এমনকি আমেরিকার মূলধারার গণমাধ্যমেও তাঁর দীর্ঘ ও প্রভাবশালী সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ বহন করে।


​সৃষ্টিশীলতার বহুমাত্রিক রূপ

সময়ের আবর্তে লেখালেখিই হয়ে উঠেছে শাম্মী তুলতুলের মূল পরিচয়। তবে তিনি কেবল একজন ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই নন; একাধারে শিশুসাহিত্যিক, নজরুল-অনুরাগী, বেতার অনুষ্ঠান পরিচালক, সংবাদ পাঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক, ভয়েস প্রেজেন্টার, দাবাড়ু ও মডেল।


​বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। ২০২২ সালের কলকাতা বইমেলায় তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘নরকে আলিঙ্গন’ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম Flipkart-এ পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর অন্যান্য বেস্টসেলার উপন্যাস ও বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘চোরাবালির বাসিন্দা’, ‘পদ্মবু’, ‘মনজুয়াড়ি’, ‘একজন কুদ্দুস ও কবি নজরুল’, ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’, ‘নান্টু ঝান্টুর বক্স রহস্য’, ‘গণিত মামার চামচ রহস্য’ এবং ‘ভূত যখন বিজ্ঞানী’। প্রতিটি বইয়ে বিনোদনের পাশাপাশি তিনি একটি শিক্ষণীয় সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন।


​দৃশ্যমাধ্যম ও গবেষণায় সাহিত্যকর্ম

শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর জনপ্রিয় গল্প ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’ দীপ্ত টিভি-তে নাট্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর রচনায় নির্মিত নাটক ‘লাল শরবত’ প্রচারিত হয়েছে সিটি এফএম-এ।


আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রভাব এতটাই যে, সম্প্রতি ভারতের একটি গবেষণামূলক কাজে তাঁর গল্প ব্যবহৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা “রুম টু রিড বাংলাদেশ”-এর এনলিস্টেড লেখিকা হিসেবেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন।

​অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রকমারি, প্রথমা, দারাজসহ সব প্রধান মাধ্যমে তাঁর বই পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি রবি বইঘর, বাংলালিংক ও এয়ারটেল অ্যাপসের মাধ্যমে পাঠকরা ই-বুক হিসেবেও তাঁর বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।


​পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:

সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ শাম্মী তুলতুল দেশী-বিদেশী অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

​কবি রোকেয়া সুফিয়া কামাল সম্মাননা (দুবার),​মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড,

​মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড,

​সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড,

​নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার,

​উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫,​ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫,

​রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ‘রবীন্দ্র রত্ন পুরস্কার ২০২৬।


​খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সম্মাননা (সেখানকার পাঠকসমাজ ভালোবেসে তাঁকে ‘রাজকন্যা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে)। ​গণমাধ্যমেও তাঁর উপস্থিতি সরব। রেডিওতে খবর পড়ার পাশাপাশি টেলিভিশনে আবৃত্তি পরিবেশন করেন তিনি। সম্প্রতি একটি ম্যাগাজিনের কভারে ‘বেগম রোকেয়া’র রূপে তাঁর মডেলিং দারুণ প্রশংসিত হয়েছে।


​সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও জীবনদর্শন

সামাজিক ও পারিবারিক নানাবিধ বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে আজকের এই অবস্থান তৈরি করাটাই শাম্মী তুলতুলের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি। নারী হিসেবে পথচলার প্রতিকূলতাকে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, তবে বিশ্বাস করেন—প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে।


​নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে এই কথাসাহিত্যিক বলেন,

​"লেখালেখি আমার কাছে শুধু একটা নেশা বা পেশা নয়—এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। মানুষের হৃদয়ে আলোর মশাল পৌঁছে দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস। সাহিত্য মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করতে পারে। পাঠকের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।"


​পিছুটান নয়, সমুখে এগিয়ে যাওয়াই যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র—সেই শাম্মী তুলতুল আজ শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সমাজ-বাস্তবতা ও মানবিকতার বার্তা হাতে তাঁর কলম দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে এক বৈশ্বিক দিগন্তে।

No comments