সাতক্ষীরা শহর এখন এক যানজটের নগরী। যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। ১০০ বছরের পুরাতন এই শহরের যানজটের প্রধান কারণ অপ্রশস্ত সড়ক। মাত্র ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটের অপ্রশস্ত সড়ক নিয়ে রীতিমত এই শহরটি ধুকছে এবং বসবাসের অযোগ্য হওয়ার পথে। সাতক্ষীরা বাসীর দীর্ঘদিনের দাবী শহরের প্রধান সড়ক গুলো ফোর লেনে রূপান্তর করা। এরই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ-শ্যামনগর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে প্যাকেজ-১ এ শহরাংশে ফোর লেন সড়ক সংযুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের টেন্ডার ও ভূমি অধিগ্রহণ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হওয়ায় সাতক্ষীরা শহরে পুনরায় ফোর লেন রাস্তা নির্মাণের এক নতুন ও সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন শুধু দরকার সাতক্ষীরার জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক প্রচেষ্টা।
সাতক্ষীরা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বিগত আওয়ামীলীগ সরকার সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ (জেড-৭৬০২) এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী (জেড-৭৬১৭) মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে শ্যামনগর এবং সীমান্তবর্তী ভেটখালী পর্যন্ত নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮২২ কোটি ৪৪ লাখ ১২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই প্রকল্পের অনুকূলে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দও রাখা হয়। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, সড়ক প্রশস্তকরণ, বিদ্যমান পেভমেন্ট পুনর্র্নিমাণ ও মজবুতীকরণ, সার্ফেসিং, আরসিসি বক্স কালভার্ট, বাস-বে এবং ড্রেন নির্মাণসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
তৎকালীন সংসদ সদস্য ডা. আ ফ ম রুহুল হকের নির্দেশনায় সাতক্ষীরা-শ্যামনগর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে সাতক্ষীরা শহরের যানজট এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা বিবেচনা করে শহরাংশের প্রথম ৫.৩০ কিলোমিটার রাস্তা চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা জমা দেয়া হয়েছিল। শহরের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সবার প্রত্যাশা ছিল, অবশেষে সাতক্ষীরা শহরের প্রধান সড়কটি আধুনিক রূপ পেতে যাচ্ছে।
কিন্তু পরবর্তীতে সাতক্ষীরার বাকি জনপ্রতিনিধিদের অসহযোগিতা ও প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ের কারণ দেখিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক প্রাথমিক প্রস্তাবনায় পরিবর্তন আনা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ৫.৩০ কিলোমিটারের ফোর লেনের প্রস্তাবনাটি বাতিল করে সেটিকে দুই লেনে নামিয়ে আনা হয়। সংশোধিত এই প্রস্তাবনাই একনেক কর্তৃক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। ফোর লেনের এই প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার ফলে সাতক্ষীরা বাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে।
ফোর লেন বাতিল হয়ে বর্তমানে যখন সড়কের কাজ চলমান রয়েছে তখন হতাশার মাঝে সাতক্ষীরা বাসীর জন্য এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছে প্রকল্পের সাম্প্রতিক একটি আর্থিক মূল্যায়ন। যেকোনো মেগা প্রকল্পে সাধারণত ব্যয় বৃদ্ধির খবরই বেশি শোনা যায়, তবে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার কারণে এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।
প্রকল্পের মোট ছয়টি প্যাকেজে কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি প্যাকেজেই প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ন্যূনতম ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি নি¤œদরে দরপত্র দাখিল করে। এর ফলে প্রকল্পের পূর্ত কাজ বা নির্মাণ ব্যয় থেকে প্রায় ১২৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্যও একটি বড় অঙ্কের বাজেট রাখা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে এবং ইতোমধ্যে আইনের ৭ ধারা সম্পন্ন হয়েছে। চূড়ান্ত প্রাক্কলনে দেখা যাচ্ছে, ভূমি অধিগ্রহণ খাতেও আনুমানিক ৪৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। সব মিলিয়ে, ঠিকাদারদের নি¤œদরে কাজ নেওয়া এবং ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় হ্রাস পাওয়ার ফলে সাতক্ষীরা-শ্যামনগর মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ১৬৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ সাশ্রয়কৃত অর্থ এখন সাতক্ষীরার উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সাশ্রয়কৃত এই ১৬৯ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না পাঠিয়ে যদি প্রকল্পের উন্নয়ন কাজে পুনরায় প্যাকেজ-১ সংশোধন করা হয়, তবে শহরাংশের ৫.৩০ কিলোমিটার সড়কটিকে এই ১৬৯ কোটি টাকা থেকে সহজেই চার লেনে উন্নীত করা সম্ভব হবে । যেহেতু অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, তাই মন্ত্রণালয় চাইলেই ডিপিপি সংশোধন করে পূর্বের চার লেনের প্রস্তাবনাটি পুনরায় যুক্ত করতে পারে। এতে শহরের যানজট নিরসন হবে এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শতভাগ সফল হবে।
সাতক্ষীরার বর্তমান ৪ জন সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক মহোদয়া, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর, সাতক্ষীরার সাংবাদিক সমাজ, সাতক্ষীরা জেলার উন্নয়ন কমিটি গুলোর দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে সাতক্ষীরার সংসদ সদস্যদের অতি সত্ত্বর সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের সাথে কথা বলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন করানোর ব্যবস্থা করা উচিত। যাতে সাতক্ষীরা শহরের ৫.৩০ কিলোমিটার সড়ক ফোর লেন রূপান্তরিত হয়।
সাতক্ষীরা একটি বর্ধিষ্ণু জেলা শহর। সময়ের সাথে সাথে এই শহরের জনসংখ্যা এবং যানবাহনের চাপ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর এলাকার রাস্তাঘাটগুলো অত্যন্ত সরু হওয়ায় প্রতিদিন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকা-ও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সাতক্ষীরা শহরের প্রবেশ মুখ থেকে শুরু করে শহরের ভেতরের অংশ পর্যন্ত প্রতিদিন ছোট-বড় অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ভোমরা স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ থেকে আসা বাস এবং স্থানীয় থ্রি-হুইলারগুলোর চাপে শহরের রাস্তাগুলো প্রায়শই অচল হয়ে পড়ে। একটি চার লেনের রাস্তা নির্মিত হলে শহরের প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ অনেকটাই কমে যাবে এবং যানজট নিরসন হবে।
সাতক্ষীরার মতো সম্ভাবনাময় একটি জেলা শহরের প্রধান সড়কের এই দুরবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাশ্রয়কৃত ১৬৯ কোটি টাকা সাতক্ষীরা বাসীর জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ। এই অর্থকে কাজে লাগিয়ে শহরাংশের সড়ককে ফোর লেনে রূপান্তর না করতে পারলে সেটি হবে বর্তমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন সংসদ সদস্যের জন্য বড় ধরনের ব্যর্থতা। সাতক্ষীরার মানুষ উন্নয়নের আশায় তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। সেই আশা নিরাশা হয়ে যাবে সাতক্ষীরা বাসীর জন্য যদি তারা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারে। আর সেই ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়বে আগামীর সকল নির্বাচনে।
সাতক্ষীরা শহরে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক ফোর লেন সড়ক নির্মাণ এখন আর কোনো অলীক কল্পনা নয়। পূর্বে ফোর লেন বাতিল হওয়ায় যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল, সাশ্রয়কৃত অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তা আনন্দে রূপান্তরিত হতে পারে। সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জোরালো ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই সাতক্ষীরা বাসীর এই প্রাণের দাবি বাস্তবায়ন সম্ভব। সাতক্ষীরা বাসী আশা করে, সাশ্রয়কৃত এই ১৬৯ কোটি টাকা দিয়ে সাতক্ষীরা শহরের ৫.৩০ কিলোমিটার ফোর লেন এবং আনুষঙ্গিক উন্নয়ন কাজ দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে এবং সাতক্ষীরা একটি আধুনিক ও যানজট মুক্ত শহর হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
সাতক্ষীরা শহর কে যানযট মুক্ত করতে শহরে ফোর লেনের নতুন সম্ভাবনা বরাদ্দ ২০০ কোটি টাকা
Reviewed by DAINIK SHOMOY BARTA
on
April 20, 2026
Rating: 5
No comments